বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম অভিযুক্ত মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে দেওয়া শাস্তিকে ‘অপর্যাপ্ত’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তদন্তে অভিযোগের আংশিক প্রমাণ মিললেও বিসিবি কেবল আজীবন নিষেধাজ্ঞা দেয়, যা জাহানারার মতে তার ভোগান্তির তুলনায় খুবই সামান্য।
স্বাধীন তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা
জাতীয় দলে খেলার সময় যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানান জাহানারা আলম। তিনি সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনেন।
এ ঘটনার পর বিসিবি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ২০২৫ সালে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিসিবির তৎকালীন পরিচালক ও নারী উইং প্রধান রুবাবা দৌলার নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে ছিলেন আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মীরা। ২০২৬ সালে তারা তাদের রিপোর্ট জমা দেয়।
রিপোর্টে জাহানারার আনা চারটি অভিযোগের মধ্যে দুইটির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়। এরপর মঞ্জুকে বিসিবির সব ধরনের কার্যক্রম থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এই শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
আইনি ব্যবস্থার দাবি, কিন্তু উদ্যোগ নেই
ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠলেও বিসিবি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এদিকে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিসিবির বোর্ডেও পরিবর্তন এসেছে এবং নতুন অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব নিয়েছে।
ভিডিও বার্তায় জাহানারার ৩ দাবি
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেইজে এক ভিডিও বার্তায় জাহানারা আলম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানান।
তিনি তদন্তে সহায়তা করার জন্য ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের ধন্যবাদ জানান। একইসাথে বিসিবির উদ্যোগের প্রশংসা করলেও শাস্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
“আমার সাথে যা হয়েছে, তার তুলনায় এই শাস্তি খুবই সামান্য,” বলেন জাহানারা।
“আমার মতো আরও অনেক জাহানারা আছে”
জাহানারা বলেন, তার মতো আরও অনেক নারী ক্রীড়াবিদ একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মঞ্জু এবং তার সহযোগীরা তাকে মানসিক নির্যাতন, সুযোগ বঞ্চনা এবং আর্থিক ক্ষতির মধ্যে ফেলেছেন, কারণ তিনি তাদের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হননি।
তার প্রথম দাবি:
মঞ্জু এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করা।
আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্যে ক্ষোভ
সাবেক বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেটার আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্যেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জাহানারা। তিনি বলেন, কোনো যাচাই ছাড়াই তার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
“আপনার নিজের পরিবারের নারীরা যদি ক্রিকেট খেলত, তাহলে কি এমন মন্তব্য করতেন?” — প্রশ্ন তোলেন তিনি।
দ্বিতীয় দাবি: সকল অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার
জাহানারা আরও বলেন, তার কথা বলার পর অনেক নারী ক্রীড়াবিদ সাহস করে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
তার দ্বিতীয় দাবি:
সকল অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা, যাতে ভুক্তভোগীরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
তিনি জানান, ২০২১ সালে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়, যা তাকে আরও ভীত করে তোলে।
তৃতীয় দাবি: ক্রীড়াঙ্গনে নিরাপত্তা নীতি
জাহানারা প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে ক্রীড়াঙ্গনে নারী ও শিশুদের জন্য একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা (safeguarding) নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর মতো:
- অনুমতি ছাড়া শারীরিক স্পর্শ না করা
- অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা
- বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা
এসব ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
“আমরা চাই নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে ভয় ছাড়া দেশের জন্য খেলতে পারব,” বলেন তিনি।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
দীর্ঘদিন জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়া জাহানারা আলম বর্তমানে ক্রিকেট থেকে কিছুটা দূরে আছেন। কবে তিনি মাঠে ফিরবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ন্যায়বিচারের জন্য তার এই লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
Sign in to leave a comment.